নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু : ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অমর নায়ক
- Israil Mallick
- 29 Jan, 2026
পীযূষ সিংহ রায়
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বহু ত্যাগ, আন্দোলন ও বিপ্লবে পরিপূর্ণ। এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম এবং বিশেষভাবে স্মরণীয় হলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং সাহস, আত্মত্যাগ ও অদম্য দেশপ্রেমের প্রতীক।নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি, উড়িষ্যার কটক শহরে। শৈশবেই তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক গভীরতা। খেলনার ঘোড়ার চেয়েও সে বেশি তাকিয়ে থাকত সত্যিকারের ঘোড়ায় চড়া ব্রিটিশ অফিসারদের দিকে। তার চোখে ভয় ছিল না—ছিল বিস্ময় আর রাগ।একদিন সে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ওরা কেন আমাদের ওপর চেঁচায়?”বাবা চুপ করে ছিলেন। সেই চুপই সুভাষকে উত্তর দিয়েছিল। শৈশবকাল থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও চিন্তাশীল। ছাত্রজীবনে তাঁর চরিত্রে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায়। স্কুলে সুভাষ ছিল উজ্জ্বল ছাত্র। কিন্তু সে শুধু নম্বরের জন্য পড়ত না। সে প্রশ্ন করত—ইতিহাসে কেন আমরা পরাজিত? কেন আমাদের নামের পাশে শাসিত শব্দটি লেখা?শিক্ষকরা তাকে ভালোবাসতেন, আবার ভয়ও পেতেন। কারণ সুভাষ শুধু পড়ত না—সে ভাবত।যখন সে বড় হলো, চারদিকে সবাই বলল— “এই ছেলে অনেক দূর যাবে।”কেউ বুঝল না—সে কোন দিকে যাবে। ইংল্যান্ডে যাওয়ার সময় জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “আমি ফিরব। কিন্তু চাকরি নিয়ে নয়—লড়াই নিয়ে।” ব্রিটিশ শাসনের অন্যায় ও অত্যাচার তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। ইংল্যান্ড - সভ্যতা, শৃঙ্খলা, ক্ষমতার কেন্দ্র। ICS পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর চারদিকে অভিনন্দন। ব্রিটিশ অফিসাররা তার পিঠ চাপড়ে দেয়। ভারতীয় অভিজাতরা গর্ব করে কিন্তু রাতে একা ঘরে বসে সুভাষের বুকের ভেতর যেন কিছু চাপা পড়ে যাচ্ছিল। সে কল্পনা করল— একদিন সে আদেশ দিচ্ছে, আর আদেশ মানছে ভারতীয় মানুষ। তার কলমে সই হচ্ছে এমন আইন, যা তার দেশের মানুষকে দমন করবে। হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল,কাগজ টানল। কলম ধরল, সে লিখল—পদত্যাগ। সেই মুহূর্তে সে জানত—এই সিদ্ধান্ত তার জীবন সহজ করবে না। কিন্তু সহজ জীবন সে চায়নি।উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং সেখানে কৃতিত্বের সঙ্গে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এই পদ ছিল ব্রিটিশ ভারতের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সম্মান। কিন্তু দেশের পরাধীন অবস্থার কথা চিন্তা করে তিনি এই পদ ত্যাগ করেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে দেশপ্রেম তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সাফল্যের ঊর্ধ্বে ছিল।ভারতে ফিরে সে যেন বিস্ফোরণ ঘটাল। সভা, মিছিল, বক্তৃতা—সবখানে তার কণ্ঠে ছিল বজ্র।গান্ধীজির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। গান্ধী বলেছিলেন, “অহিংসাই শেষ কথা।”সুভাষ মাথা নত করেছিলেন, কিন্তু ভেতরে বলেছিলেন— “শেষ কথা তখনই বলা যায়, যখন শত্রু শুনতে রাজি।” দু’বার কংগ্রেস সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও সে আপস করল না। ক্ষমতা তার হাত ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল,কিন্তু আদর্শ রইল। ব্রিটিশরা এবার ভয় পেল। কারণ এই মানুষটা শুধু কথা বলে না—মানুষকে বদলে দেয়।ভারতে ফিরে এসে তিনি সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তবে স্বাধীনতা অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে তাঁর মতভেদ ছিল। নেতাজি বিশ্বাস করতেন যে কেবল অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানো সম্ভব নয়; প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রামও জরুরি। তিনি দু’বার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু আদর্শগত মতবিরোধের কারণে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার ও অন্তরীণ করে, তবু তিনি দমে যাননি।১৯৪১-এর এক শীতের রাত। নীরবতা এত গভীর যে নিজের নিঃশ্বাসও শব্দ করে। ছদ্মবেশে সুভাষ দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল। একজন মানুষ নয়—একটি আগুন পালিয়ে গেল। পরদিন সকালে ব্রিটিশ অফিসাররা শুধু একটি ঘর খালি পেল। আর একটি সাম্রাজ্য আতঙ্কে কেঁপে উঠল।১৯৪১ সালে তিনি গৃহবন্দি অবস্থা থেকে পালিয়ে বিদেশে যান। জার্মানি , জাপান , বিদেশি মাটি কিন্তু স্বপ্ন ভারতীয়। সুভাষ বন্দি সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “তোমরা বন্দি নও। তোমরা ইতিহাসের অপেক্ষমাণ অধ্যায়।”সেই মুহূর্তে জন্ম নিল আজাদ হিন্দ ফৌজ। যখন নারীরা বন্দুক হাতে শপথ নিল, ইতিহাস স্তব্ধ হয়ে গেল।রানি ঝাঁসির রেজিমেন্ট—শুধু বাহিনী নয়, এক ঘোষণা। জার্মানি ও পরে জাপানের সহায়তায় তিনি গঠন করেন আজাদ হিন্দ ফৌজ (Indian National Army)। তাঁর আহ্বান— “আমায় রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” ………..ভারতীয়দের মনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। তাঁর নেতৃত্বে INA ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন মাত্রা যোগ করে। নেতাজি আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন। যদিও সামরিকভাবে INA চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি, তবুও এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। INA-র সৈন্যদের বিচার ভারতবাসীর মধ্যে তীব্র প্রতিবাদ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করে।১৯৪৫ সালে নেতাজির অন্তর্ধান আজও এক রহস্য। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে নানা মত থাকলেও, তাঁর অবদান ও আদর্শ অমর হয়ে আছে। কেউ বলল—তিনি মারা গেছেন। কেউ বলল—তিনি ফিরে আসবেন। কিন্তু সত্য একটাই— তিনি কখনো যাননি। তিনি আছেন সেই সাহসে, যে মাথা নত করে না। তিনি আছেন সেই প্রশ্নে, যে অন্যায়ের সামনে চুপ করে না। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন আগুন … আর আগুন কখনো মরে না।পরিশেষে বলা যায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন এক সাহসী ও দৃঢ়চেতা নেতা, যিনি আপসহীনভাবে ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তাঁর দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও নেতৃত্ব আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *
